ছাত্র কল্যাণ পরিষদ

উত্তরমুলাইম মল্লিকসরাই ফাজিল মাদ্রাসা

ম্যাগাজিন লাইব্রেরি

কবিতা, সাহিত্য, কুরআন ও হাদিস এবং বিশেষ প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত সংখ্যাসমূহ।

Special

ঝড়ের দিনে আলোর দিশারী

​বছরটি ছিল ২০১৯। রমজানের ঠিক কাছাকাছি সময়, মাসটি ছিল বৈশাখ। প্রকৃতির রূপ তখন বেশ উত্তাল—চারিদিকে মাঝেমধ্যেই কালবৈশাখী ঝড়-তুফানের গর্জন। প্রকৃতির এই ঝড়ের সাথে সাথে আমার মনের ভেতরেও বইছিল এক অদৃশ্য ঝড়। কারণ, আমি তখন সদ্য এক নতুন মাদরাসায় পা রেখেছি। জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু করার আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি অচেনা পরিবেশ আর প্রথম পরীক্ষার অজানা আতঙ্কও প্রতিনিয়ত তাড়া করছিল। রমজান আসার ঠিক আগমুহূর্তেই ঘোষণা এল আমাদের প্রথম টিউটোরিয়াল পরীক্ষার। অচেনা শিক্ষক, নতুন বন্ধু, আর বিশাল সিলেবাস—সব মিলিয়ে পরীক্ষা কেমন হবে, এই নিয়ে নানান দুশ্চিন্তা আমার কিশোর মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ​পরীক্ষার দিন সকালে অবশ্য আকাশটা বেশ স্বাভাবিকই ছিল। মনে হচ্ছিল আবহাওয়া অনুকূলেই থাকবে। কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে চারপাশ বদলে গেল—এলো এক তীব্র কালবৈশাখী ঝড়। চারপাশ থেকে শিমুল তুলা এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াতে লাগল। সেবার আমি ছিলাম চতুর্থ তলার ১৯ নম্বর রুমে। সেই রুমের মুখোমুখি দুটি জানালা দিয়ে ঝড়ো হাওয়ায় তুলা হুড়মুড় করে ঢুকছিল আর বের হচ্ছিল। প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের দাপটে আমাদের মনে এক ধরনের স্বস্তি চলে এল। সবার মনেই তো এই চিন্তাই জাগবে—এত বড় ঝড়ে আজ কি আর পরীক্ষা হওয়া সম্ভব? কেউ কেউ তো ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজে কাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতিও নিল যে, আজ আর পরীক্ষা হবে না, একটু শান্তিতে রিলাক্স করা যাক! ​সবাই যখন সেই রিলাক্সের আমেজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই জানালার পাশ থেকে কার যেন একটা কৌতূহলী চিৎকার ভেসে এল—“এই দেখ, মাদরাসায় কে যেন আসছে!” ​কৌতূহল দমন করতে না পেরে আমি দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিলাম। দেখলাম, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় একটি মোটরসাইকেল এসে থামল। আরোহী পরে আছেন একটি রেইনকোট। মোটরসাইকেল থেকে নেমে তিনি একে একে রেইনকোট ও হেলমেট খুললেন। মুখের জল মুছতেই দেখলাম—তিনি আর কেউ নন, আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ হযরত মাওলানা শামসুল ইসলাম হুজুর! ​চারিদিকে যখন কেউ এসে পৌঁছায়নি, এমনকি মাদরাসায় যখন কোনো দপ্তরীরও দেখা নেই, ঝড়ের তীব্রতায় যখন সবাই ঘরবন্দী, ঠিক তখন আমাদের প্রিন্সিপাল হুজুর সবার আগে নিজে মাদরাসায় হাজির হলেন। হোস্টেলে এসে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ডেকে বললেন—“সবাই তাড়াতাড়ি করে রেডি হও, আজ পরীক্ষা হবে!” হুজুরের সেই অটল নিষ্ঠা আর সময়ানুবর্তিতা দেখে আমাদের সব আলস্য নিমিষেই উবে গেল। ​আজ পেছনে ফিরে তাকালে গভীরভাবে উপলব্ধি করি—সেদিন তিনি দায়িত্ববান ও দূরদর্শী ছিলেন বলেই আজ আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এককালের সাধারণ ‘আলিম’ মাদরাসাটি আজ তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অদম্য দায়িত্ববোধের কারণে ‘উত্তরমুলাইম মল্লিক সরাই ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা’ নামে পূর্ণাঙ্গ ফাজিল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং দেশজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেছে। ​হুজুরের সেই অতুলনীয় দায়িত্ববোধ আমাদের শিখিয়েছে—কর্তব্যের কাছে কোনো প্রাকৃতিক বাধাই বাধা হতে পারে না। ২০১৯ সালের সেই বৈশাখী সকাল আর আমাদের প্রিন্সিপাল হুজুরের সেই আদর্শিক রূপ আজও আমার হৃদয়ে এক গভীর অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে আছে। আব্দুল কাইয়ুম ভিপি, ছাত্র সংসদ উত্তরমুলাইম মল্লিক সরাই ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা ছাত্র কল্যাণ পরিষদ।
Special

উদারতার অনুপম আদর্শ – হযরত মোহাম্মদ সাঃ

উদারতার অনুপম আদর্শ—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাহেলিয়াত ও মানবিকতার বিপর্যয় যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই বিশ্বমানবতার জন্য রহমত ও হেদায়াতের বার্তা নিয়ে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পৃথিবীতে আগমন করেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব সম্পর্কে বলেন— “আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” —সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭ কথিত নাস্তিক আসাদ নূর হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ব্যক্তিগত আক্রমণনির্ভর। নিম্নে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান চরিত্র ও উদারতার কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। অমুসলিমদের প্রতিও মহানুভবতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন ঈমানদারদের প্রতি দয়ালু ছিলেন, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা ও সদাচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে— “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ওপর জুলুম করবে, অথবা তার অধিকার কমিয়ে দেবে, কিংবা তাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজে বাধ্য করবে, অথবা তার অনুমতি ছাড়া তার কাছ থেকে কোনো কিছু নিয়ে নেবে—কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হব।” ভুলের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও সহনশীলতা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর এই কর্মকাণ্ড দেখে তাকে শাসন করতে উদ্যত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের থামিয়ে বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও।” এরপর যেখানে সে প্রস্রাব করেছে, সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমাদের সহজতা সৃষ্টিকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে; কঠিনতা সৃষ্টিকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি।” —সহিহ বুখারি এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও তিনি কঠোরতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও কোমলতার পথ অবলম্বন করতেন। কর্মচারী ও খাদেমদের সঙ্গে আচরণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহানুভবতায় সিক্ত হয়ে আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “আমি দশ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি। কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি—এমন কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলে কখনো বলেননি—এমন কেন করলে না?” —সহিহ বুখারি একজন কর্মচারী বা খাদেমের সঙ্গে এমন কোমল ও মানবিক আচরণ তাঁর অসাধারণ চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। মক্কা বিজয় ও সাধারণ ক্ষমা মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধীদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের উদ্দেশে ক্ষমা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী মনে করো, আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করব?” তারা বলল, “আপনি একজন সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান। আমরা আপনার কাছ থেকে কল্যাণ ছাড়া কিছুই প্রত্যাশা করি না।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সেই বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন— “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” —সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২ এরপর তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এভাবেই বিজয়ের মুহূর্তেও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মহানুভবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মক্কা বিজয়ের পর কয়েকজন ব্যক্তি তাদের গুরুতর অপরাধের কারণে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে ছিল। তাদের মধ্যে হাব্বার ইবনে আসওয়াদও ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দেন। এ ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও উদারতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উম্মতের প্রতি নবীজির ভালোবাসা ঈমানদার উম্মতের জন্য নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আখিরাতের জন্যও তিনি উম্মতের কল্যাণ কামনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— “প্রত্যেক নবীর এমন একটি দোয়া রয়েছে, যা অবশ্যই কবুল করা হয়। প্রত্যেক নবী তাঁর সেই দোয়া দুনিয়াতেই করে নিয়েছেন। আর আমি আমার সেই দোয়া কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য সংরক্ষণ করেছি।” —সহিহ মুসলিম এটাই ছিল তাঁর উম্মতের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ। সবশেষে মোশাররফ হোসেন খানের কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি দিয়ে শেষ করছি— «রাসুলকে যারা করে ঘৃণা, অপমান, কষ্টে কাঁপে মাটি, কাঁপে সাত আসমান। কলিজায় লাগে চোট, হয় রক্তপাত, তাদের জন্য আমার শত অভিশাপ।» হে রহিম, হে রহমান! যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, কী করে সইতে পারি বল—রাসুলের অপমান? আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান চরিত্র অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। ছাব্বির আহমদ শিক্ষার্থী ইসলামের ইতিহাস বিভাগ মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ