ছাত্র কল্যাণ পরিষদ

উত্তরমুলাইম মল্লিকসরাই ফাজিল মাদ্রাসা

উদারতার অনুপম আদর্শ – হযরত মোহাম্মদ সাঃ

উদারতার অনুপম আদর্শ—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাহেলিয়াত ও মানবিকতার বিপর্যয় যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই বিশ্বমানবতার জন্য রহমত ও হেদায়াতের বার্তা নিয়ে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পৃথিবীতে আগমন করেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব সম্পর্কে বলেন—

“আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”

—সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭

কথিত নাস্তিক আসাদ নূর হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ব্যক্তিগত আক্রমণনির্ভর। নিম্নে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান চরিত্র ও উদারতার কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

অমুসলিমদের প্রতিও মহানুভবতা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন ঈমানদারদের প্রতি দয়ালু ছিলেন, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা ও সদাচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে—

“যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ওপর জুলুম করবে, অথবা তার অধিকার কমিয়ে দেবে, কিংবা তাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজে বাধ্য করবে, অথবা তার অনুমতি ছাড়া তার কাছ থেকে কোনো কিছু নিয়ে নেবে—কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হব।”

ভুলের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও সহনশীলতা

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর এই কর্মকাণ্ড দেখে তাকে শাসন করতে উদ্যত হলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের থামিয়ে বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও।” এরপর যেখানে সে প্রস্রাব করেছে, সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে নির্দেশ দিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমাদের সহজতা সৃষ্টিকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে; কঠিনতা সৃষ্টিকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি।”

—সহিহ বুখারি

এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও তিনি কঠোরতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও কোমলতার পথ অবলম্বন করতেন।

কর্মচারী ও খাদেমদের সঙ্গে আচরণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহানুভবতায় সিক্ত হয়ে আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—

“আমি দশ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি। কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি—এমন কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলে কখনো বলেননি—এমন কেন করলে না?”

—সহিহ বুখারি

একজন কর্মচারী বা খাদেমের সঙ্গে এমন কোমল ও মানবিক আচরণ তাঁর অসাধারণ চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।

মক্কা বিজয় ও সাধারণ ক্ষমা

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধীদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের উদ্দেশে ক্ষমা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী মনে করো, আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করব?”

তারা বলল, “আপনি একজন সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান। আমরা আপনার কাছ থেকে কল্যাণ ছাড়া কিছুই প্রত্যাশা করি না।”

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সেই বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন—

“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”

—সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২

এরপর তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এভাবেই বিজয়ের মুহূর্তেও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মহানুভবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মক্কা বিজয়ের পর কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের গুরুতর অপরাধের কারণে সাধারণ ক্ষমার আওতার বাইরে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হাব্বার ইবনে আসওয়াদও ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দেন।

এ ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও উদারতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

উম্মতের প্রতি নবীজির ভালোবাসা

ঈমানদার উম্মতের জন্য নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আখিরাতের জন্যও তিনি উম্মতের কল্যাণ কামনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—

“প্রত্যেক নবীর এমন একটি দোয়া রয়েছে, যা অবশ্যই কবুল করা হয়। প্রত্যেক নবী তাঁর সেই দোয়া দুনিয়াতেই করে নিয়েছেন। আর আমি আমার সেই দোয়া কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সুপারিশের জন্য সংরক্ষণ করেছি।”

—সহিহ মুসলিম

এটাই ছিল তাঁর উম্মতের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ।

সবশেষে মোশাররফ হোসেন খানের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি দিয়ে শেষ করছি—

«রাসুলকে যারা করে ঘৃণা, অপমান,
কষ্টে কাঁপে মাটি, কাঁপে সাত আসমান।
কলিজায় লাগে চোট, হয় রক্তপাত,
তাদের জন্য আমার শত অভিশাপ।»

হে রহিম, হে রহমান!
যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
কী করে সইতে পারি বল—রাসুলের অপমান?

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান চরিত্র অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

ছাব্বির আহমদ

শিক্ষার্থী
ইসলামের ইতিহাস বিভাগ
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

শেয়ার করুন